⁜ অর্থ-বাণিজ্য

⁜ প্রযুক্তি

⁜ বিনোদন

শেরপুরের প্রথম শহীদ আসিফের পরিবারে এখনো শোকের মাতম চলছেই

HTML tutorial

নিজস্ব প্রতিবেদক :
২০২৪ এর ১৯ জুলাই বৈষম্য বিরোধী ছাত্র জনতার আন্দোলনে ঢাকার মিরপুরে শহীদ হয়েছিলেন শেরপুরের ছেলে আসিফুর রহমান আসিফ। আর তিনিই ছিলেন শেরপুরের জুলাই আন্দোলনের প্রথম শহীদ। তার বাড়ি শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার রামচন্দ্রকুড়া ইউনিয়নের কেরেঙ্গাপাড়া গ্রামে। এখনো কাটেনি শহীদ আসিফের পরিবারের শোকের মাতম। বাবা মা সযত্নে রেখেছেন ছেলে আসিফের শেষ স্মৃতি রক্তমাখা নিজের শার্ট ও লুঙ্গি। আর ছেলের কথা মনে হলেই সেই রক্তমাখা লুঙ্গি ও শার্ট সামনে ধরে চোখের জলে বুক ভাসিয়ে কষ্ট লাঘব করেন।
২০২৪ সালের ১৯ জুলাই বিকেলে বন্ধুদের সাথে দেখা করতে বাসা থেকে বেরিয়েছিল সতেরো বছর বয়সী আসিফুর রহমান আসিফ। কিন্তু মিরপুর-১০ এর বেনারসি পল্লীর রাস্তায় হোটের রাব্বানীর সামনে গিয়েই পুলিশের ছোঁড়া গুলিতে গুলিবিদ্ধ হয় আসিফ। পরে রাতেই নিওরোসায়েন্স হাসপাতালে বাবার কোলেই শেষ বিদায় নেয় আসিফ। শেষ হয়ে যায় একটি পরিবারের স্বপ্ন। সেই থেকে ছেলের রক্তমাখা নিজের শার্ট ও লুঙ্গি আজও সযত্নে রখেছেন শহীদ আসিফের বাবা আমজাদ হোসেন। আসিফ মীরপুরে শহীদ হলেও তার বাড়ি শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার রামচন্দ্রকুড়া ইউনিয়নের কেরেঙ্গাপাড়া গ্রামে। ২৪ এর গণঅভ্যুত্থানে শেরপুরের প্রথম শহীদ এই আসিফ।

কেরেঙ্গাপাড়া গ্রামে ভোগাই নদীর তীরে বেড়ে ওঠা আসিফের। পড়ালেখায় বেশিদূর এগুতে না পারায় সংসারের হাল ধরতে কয়েক বছর আগে বাবার সাথে পাড়ি জমায় রাজধানীর মিরপুরে। সেখানে বাবা-ছেলে মিলে একটি ভাড়া বাসায় থাকতো। ছোটখাটো জুট ব্যবসায়ী দরিদ্র বাবার ব্যবসায় সহযোগিতা করতো আসিফ।

১৯ জুলাই শুক্রবার বিকেল সাড়ে ছয়টার দিকে মিরপুর-১০ এর জুটপট্টির ভাড়া বাসা থেকে বের হয় পানির ট্যাঙ্কির কাছেই বন্ধুদের সাথে দেখা করতে যায়। একই সাথে বাসা থেকে বের হন তার বাবা আমজাদ হোসেন। বেনারসি গলিতে পৌছামাত্রই রাব্বানী হোটেলের সামনে রিকশায় থাকা আসিফ ও তার বন্ধ মাহফুজুকে আন্দোলনকারী ভেবে গুলি ছোঁড়ে পুলিশ। সাথে সাথেই দুই বন্ধু লুটিয়ে পড়ে। ফোন যায় আসিফের বাবার কাছে। বলা হয়, আসিফ এক্সিডেন্ট করেছে। ফোন পেয়ে দ্রুত আলোক হাসপাতালে ছুটে যান বাবা আমজাদ হোসেন। সেখানে গিয়ে আসিফকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় দেখতে পান। এরপর আসিফকে আলোক হাসপাতাল থেকে রিকশায় করে নেন সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে। সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নেওয়ার পর ব্যান্ডেজ করে দিয়ে রেফার্ড করা হয় নিওরো সাইন্স হাসপাতালে। বাবা আমজাদ হোসেন সেখান থেকে সাড়ে আটটার দিকে নিওরোসাইন্স হাসপাতালে নিয়ে যান রিকশায় করে। এরপর ভর্তি করা হলে নয়টা চল্লিশের দিকে আমজাদ হোসেন বুঝতে পারেন, ছেলে আসিফ আর এ পৃথিবীতে নেই।

এরপর মরদেহ নিজ বাড়িতে আনতে ছুটে যান পার্শ্ববর্তী থানায়। সেখান থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়, এ থানায় কোন গুলি হয়নি। হাসপাতালে যোগাযোগ করতে হবে। আবারও হাসপাতালে ছুটে যান ছেলের মরদেহ আনতে। একপর্যায়ে পুলিশ ও হাসপাতাল ঘুরে অনেক কষ্টে অতিরিক্ত ভাড়া গুণে মরদেহ নিয়ে আসেন গ্রামের বাড়ি। কোনপ্রকার প্রচারণা ছাড়াই পরদিন ২০ জুলাই তড়িঘড়ি করে নিজ বাড়ির কাছে থাকা কেরেঙ্গাপাড়া কবরস্থানে দাফন করেন আসিফকে।

শহীদ আসিফের বাবা আমজাদ হোসেন জানান, আমার ছেলে শহীদ হয়েছে এক বছর হলো। মামলা করতে গিয়ে তিনবার আদালতে গিয়েছিলাম। এতটুকুই জানি। এরপর কি হয়েছে, কি হচ্ছে, কিছুই জানি না। আমি সরকারের কাছ থেকে টাকা পেয়েছি। টাকা দিয়ে কি হবে? আমি তো আমার ছেলেকে ফিরে পাব না। আমার ছেলের অনেক স্বপ্ন ছিল। সে স্বপ্নগুলো পূরণ করে যেতে পারেনি। তাই মৃত্যুর সময় আমার কোলে মাথা রেখে বলে গেছে, “আমি তোমাদের জন্য কিছুই করতে পারলাম না বাবা। তোমরা আমাকে ক্ষমা করে দিও।

৫ আগস্ট দেশের প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর ২ নভেম্বর ঢাকার আদালতে বাদী হয়ে মামলা করেন আমজাদ হোসেন। মামলায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ মোট আসামী করা হয় ২০১ জনকে। তবে এর অগ্রগতি নিয়ে হতাশ তিনি। এখনো রক্তমাখা শার্ট আর লুঙ্গি দেখে কাঁদেন আসিফের বাবা-মা-স্বজনেরা। মামলাটি গ্রহণ করে তা তদন্ত দেওয়া হয় সিআইডি ঢাকা মেট্রো উত্তরকে। তদন্তের দায়িত্ব পান সিআইডি ঢাকা মেট্রো উত্তর এর পুলিশ পরিদর্শক আলতাফ হোসেন।

পরবর্তীতে আসিফের গ্রামের বাড়ি কেরেঙ্গাপাড়া কবরস্থান থেকে মরদেহ উত্তোলন করা হয় সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন সম্পন্নের জন্য। আসিফের মৃত্যুর এক বছর পার হলেও মামলাটির তদন্তকাজ শেষ হতে এখনো সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন সিআইডি, ঢাকা মেট্রো উত্তর এর পুলিশ পরিদর্শক আলতাফ হোসেন।

তিনি বলেন, লাশ দাফনের সময় সুরতহাল করা হয়নি। ময়নাতদন্ত করা হয়নি। তাই আদালতের নির্দেশে আমরা কবর থেকে মরদেহ উত্তোলন করেছি। এর সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত করেছি। মামলাটির চাজর্চশীট দিতে যেসব প্রক্রিয়ায় এগুতে হয়, তার অনেক কাজ বাকী আছে। তদন্ত চলছে। আরও সময় লাগবে।

HTML tutorial

Leave a Reply